মঙ্গলবার, ৪ অক্টোবর, ২০২২

চরিতকথা - রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী রচিত প্রবন্ধ 'বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়'

 

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী রচিতচরিতকথাথেকে

চরিতকথা - রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী 


(১৩১২ সালের ২৬শে চৈত্র ক্ল্যাসিক থিয়েটারে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে আহূত স্মৃতি-সভায় বঙ্কিমচন্দ্র সম্বন্ধে নিবন্ধটি লেখক কর্তৃক পঠিত হয়।)

 

বারো বৎসর অতীত হইল, বঙ্কিমচন্দ্র তাঁহার শ্যামাঙ্গনী জননীর অঙ্কদেশ শূন্য করিয়া চলিয়া গিয়াছেন; কিন্তু এত দিন আমরা তাঁহার স্মৃতির সম্মানার্থ কোনরূপ আয়োজন আবশ্যক বোধ করি নাই। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রাতি আমাদের কর্তব্য-বুদ্ধি যে এত দিন জাগে নাই, তাহা আমাদের অবস্থার পক্ষে স্বাভবিক। বারো বৎসর পরে যদি সেই কর্তব্যবুদ্ধি জাগিয়৷ থাকে, সেই প্রবুদ্ধিসাধনে আমাদের কৃতিত্ব বিচার্য বিষয়। বঙ্কিমচন্দ্র স্বয়ং কোন্‌ তপোলোকে বা সত্যলোকে অবস্থিত হইয়াও মর্ত্যলোকে তাঁহার দুঃখিনী জননীকে আজও ভুলতে পারেন নাই;— সেইখানেই বসিয়া “তুমি বিদ্যা, তুমি ধর্ম, তুমি হৃদি, তুম মর্ম, তং হি প্রাণাঃ শরীরে”[] বলিয়া কাতরকণ্ঠে গান গাহিতেছেন;— আর মানবের অশ্রুতিগোচর সেই সঙ্গীত সপ্তকোটি কণ্ঠে কলকল নিনাদ উত্থাপিত করিয়া বঙ্গভূমিকে জাগ্রত করিয়াছে। আমাদের কর্তব্যবুদ্ধি আজ যদি জাগিয়া থাকে, স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্রই আমাদিগকে জাগাইয়াছেন, আমাদের উহাতে কোন কৃতিত্ব নাই।

 

বঙ্কিমচন্দ্রের স্মৃতির উপাসনার জন্য আজিকার সভা আহূত হইয়াছে; এবং যাঁহারা এই উপাসনার আয়োজন করিয়াছেন এবং এই উপাসনাকর্মকে সন্তবতঃ সাংবৎসরিক অনুষ্ঠানে পরিণত করিতে ইচ্ছা করেন, তাহারা, কি কারণে জানি না, আজিকার অনুষ্ঠানের প্রধান ভার আমার উপর অর্পণ করিয়াছেন আমার প্রতি তাহাঁদিগের এই অহৈতুকী শ্রদ্ধার পরিচয় পাইয়া ও বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতি আমার ভক্তিপ্রকাশের অবসর লাভ করিয়া আমি যুগপৎ গর্ব ও আনন্দ অনুভব করিতেছি, কিন্তু যোগ্যতর পাত্রে এই ভার অর্পিত হইলে উপস্থিত ভদ্রমণ্ডলীকে বঞ্চিত হইতে হইত না। কেবল যে সময়োচিত বিনয়প্রকাশের জন্য আমি এ কথা বলিতোছি, তাহা নহে; বঙ্কিমচন্দ্র যে বিস্তীর্ণ বঙ্গীয়-সাহিত্যের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব গ্রহণ করিয়া তাঁহার সহবর্তী ও পরবর্তী অনুচরগণের পথপ্রদর্শক হইয়া গিয়াছেন, আমিও সেই বঙগীয়-সাহিত্য-ক্ষেত্রের এক প্রান্তে এক সঙ্কীর্ণ পথ আশ্রয় করিয়া মন্দগতিতে ধীরে ধীরে পদক্ষেপে সাহসী হইয়াছি ; ইহাই আমার জীবনের কাজ ও ইহাই আমার জীবিকা। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র তাঁহার প্রতিভার অত্যুজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হস্তে করিয়া সাহিত্যক্ষেত্রের যে যে অংশ প্রদীপ্ত করিয়াছিলেন, সেই সেই অংশে আমার “প্রবেশ নিষেধ”। আমি দূর হইতে সেই আলোর উজ্জ্বল দীপ্তিতে মুগ্ধ হইয়াছি মাত্র, কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রের ভাগ্যবান সহচরগণের ও অনুচরগণের পদাঙ্ক অনুসরণ করিতেও আমি অধিকারী নহিআজিকার আয়োজনের অনুষ্ঠাতাদিগের অনুগ্রহজন্য অকপট কৃতজ্ঞতাস্বীকারে আম বাধ্য আছি; কিন্তু আমি আশা করি যে, আপনারা তাহাদের পাত্রনির্বাচনে বিষয়বুদ্ধির প্রশংসা করিবেন না।

 

বাঙ্গালীর জীবনের উপর বঙ্কিমচন্দ্র কত দিকে কত উপায়ে প্রভূত্ব বিস্তার করিয়াছেন, তাহা আমরা জানি; কিন্তু বাঙ্গালার বাহিরে সম্ভবতঃ তিনি বাঙ্গালার সার্‌ ওয়াল্টার স্কট মাত্র[] ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রের সহিত পরিচয় অতি অল্প বয়সেই ঘটিয়াছিল, সে বয়সে উপন্যাসগ্রন্থের সহিত আমার পারিচয় বড়-একটা স্পৃহণীয় বলিয়া বিবেচিত হয় নাই। আমার যখন আট বংসর বয়স, তখন বঙ্গদর্শনে বিষবৃক্ষ' বাহির হইতোছিল এবং আমি বঙ্গদর্শনের কয়েক সংখ্যা হইতে বিষবৃক্ষের দুই-চারিটি পরিচ্ছেদ আত্মসাৎ কায়াছিলাম সেই বয়সে বিষবৃক্ষের সাহিত্য-রসের কিরূপ আস্বাদ অনুভব করিয়াছলাম, তাহা ঠিক মনে নাই; তবে এ কথা বেশ মনে আছে যে, পাঠশালায় গিয়৷ তারিণীচরণ চট্টোপাধ্যায়-প্রণীত ভূগোল বিবরণের ভারতবর্ষের অধ্যায়ে গঞ্জাম গঞ্জাম, চত্বরপুর চত্বরপুর, মসলিপটম মসলিপটম, আর্কট আর্কট, মাদুরা মাদুরা, টিনিভেলি টিনিভেলি প্রভৃতি অপরূপ সুশ্রাব্য নামাবলী আবৃত্তির ত্রুটি ঘটিলে পণ্ডিত মহাশয়ের নিকট বেত্রাঘাত উপহার পাইয়া বাঙ্গালা সাহিত্যের প্রতি যে অনুরাগ দাঁড়াইয়াছিল, নগেন্দ্রনাথের নৌকাযাত্রা ও কুন্দনন্দিনীর স্বপ্নদর্শন নিতান্তই তাহার সমর্থন ও পোষণ করে নাই। আমার বেশ মনে আছে যে, ‘পদ্মপলাশলোচনে তুমি কে[] এই পরিচ্ছেদের সহিতই আমার তাৎকালিক বিষবৃক্ষ-পাঠ সমাপ্ত হয় এবং ঐ পরিচ্ছেদের শীর্ষস্থিত সংক্ষিপ্ত প্রশ্নটি মনের মধ্যে বিস্ময় ও কৌতূহলের উদ্রেক করিয়া কিছু দিনের জন্য একটা অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি করে। কিছু দিনের জন্য মাত্র, কেন না, পর-বৎসর আমি পাঠশালার পরীক্ষায় যে পুরস্কার পাইয়াছিলাম, বাড়ী ফিরিয়া দেখিলাম, তাহার রাঙা ফিতার বন্ধনের মধ্যে শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-প্রণীত দুর্গেশনন্দিনী ও বিষবৃক্ষ নামক দুইখানি পুস্তক রহিয়াছে। সভাস্থলে যাঁহারা পিতার বা পিতৃস্থানীয় অভিভাবকের গৌরবযুক্ত পদবী গ্রহণ করেন, তাঁহারা শুনিয়া আতঙ্কিত হইবেন যে, এ পুরস্কার বিতরণে গ্রন্থ নির্বাচনের ভার আমার পিতৃদেবের উপর অর্পিত ছিল এবং তিনিই আমার গঞ্জাম গঞ্জাম, চত্বরপুর প্রভৃতি সূক্ষ্ম ভৌগোলিক তত্ত্বে পারদর্শিতার পুরস্কারস্বরূপ ঐ দুইখানি গ্রন্থ নির্বাচন করিয়া তাঁহার নবম বর্ষের পুত্রের হস্তে অর্পণ করিয়াছিলেন।

 

পুরস্কারহস্তে বাড়ী আসিয়া রাত্রিটা একরকমে কাটাইয়াছিলাম, পরদিনে বিষবৃক্ষ ও তার পরদিনে দুর্গেশনন্দিনী টাইটেলপেজের হেডিং মায় মূল্য পাঁচ সিকা হইতে শেষ পর্যন্ত একরকমে উদরস্থ করি। এ দুটি গ্রন্থের কোন্‌ অংশ সর্বোৎকৃষ্ট বোধ হইয়াছিল, তাহা যদি এখন অকপটে বলিয়া ফেলি, তাহা হইলে নিশ্চয়ই আপনারা আমার কাব্যরসগ্রাহিতার প্রশংসা করিবেন না। বিষবৃক্ষের মধ্যে যেখানে ছেলের পাল “হীরার আয়ি বুড়ী হাঁটে গুঁড়িগুঁড়ি” বলিয়া সেই বৃদ্ধার পশ্চাদ্ধাবন করিয়াছিল ও বৃদ্ধার ইষ্টিরস নামক ব্যাধির প্রতিকার বিষয়ে কেষ্টরস নামক ওষুধের উপযোগিতা সম্বন্ধে প্রতিবেশীর সহিত আলাপ করিতেছিল, সেই স্থানটাই গ্রন্থের মধ্যে সবোৎকৃষ্ট বলিয়া সাব্যস্ত করিয়াছিলাম ।


সম্পূর্ণ প্রবন্ধটির ১ম পর্ব পাঠ করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন। 

এই প্রবন্ধের প্রশ্নোত্তর বা নোটসের পাসওয়ার্ড দেওয়া পিডিএফ ডাউনলোড করতে হলে এই লিঙ্কে ক্লিক করে আলোচনার ভিডিও দেখুন ও পাসওয়ার্ড জেনে নিতে হবে। 

সোমবার, ৩ অক্টোবর, ২০২২

হাওয়ার রাত - জীবনানন্দ দাশ

 

হাওয়ার রাত
জীবনানন্দ দাশ

 

গভীর হাওয়ার রাত ছিল কাল- অসংখ্য নক্ষত্রের রাত;

সারারাত বিস্তীর্ণ হাওয়া আমার মশারিতে খেলেছে;

মশারিটা ফুলে উঠেছে কখনো মৌসুমী সমুদ্রের পেটের মতো,

কখনো বিছানা ছিড়ে

নক্ষত্রের দিকে উড়ে যেতে চেয়েছে;

এক- একবার মনে হচ্ছিল আমার- আধো-ঘুমের ভিতর হয়তো-

মাথার উপরে মশারি নেই আমার

স্বাতী তারার কোল ঘেঁষে নীল হাওয়ার সমুদ্রে শাদা বকের মতো উড়ছে

সে!

কাল এমন চমৎকার রাত ছিল।

 

সমস্ত মৃত নক্ষত্রেরা কাল জেগে উঠেছিল- আকাশে এক তিল ফাঁক ছিল না;

পৃথিবীর সমস্ত ধূসর প্রিয় মৃতদের মুখও সেই নক্ষত্রের ভিতর দেখেছি আমি;

অন্ধকার রাতে অশ্বত্থের চুড়ায় প্রেমিক চিলপুরুষের শিশির-ভেজা চোখের

মতো

ঝলমল করছিল সমস্ত নক্ষত্রেরা;

জোছনারাতে বেবিলনের রানীর ঘাড়ের ওপর চিতার উজ্জ্বল চামড়ার

শালের মতো জ্বলজ্বল করছিল বিশাল

আকাশ!

কাল এমন আশ্চর্য রাত ছিল।

 

যে নক্ষত্রেরা আকাশের বুকে হাজার হাজার বছর আগে মরে গিয়েছে

তারাও কাল জানালার ভিতর দিয়ে অসংখ্য মৃত আকাশ সঙ্গে করে এনেছে

যে রূপসীদের আমি এশিরিয়ায়, মিশরে, বিদিশায় মরে যেতে দেখেছি

কাল তারা অতিদূর আকাশের সীমানার কুয়াশায়-কুয়াশায় দীর্ঘ বর্শা হাতে

করে

কাতারে- কাতের দাঁড়িয়ে গেছে যেন

মৃত্যুকে দলিত করবার জন্য?

জীবনের গভীর জয় প্রকাশ করবার জন্য?

প্রেমের ভয়াবহ গম্ভীর স্তম্ভ তুলবার জন্য?

 

আড়ষ্ট অভিভূত হয়ে গেছি আমি,

কাল রাতের প্রবল নীল অত্যাচার আমাকে ছিড়ে ফেলেছে যেন;

আকাশের বিরামহীন বিস্তীর্ণ ডানার ভিতর

পৃথিবী কীটের মতো মুছে গিয়েছে কাল!

আর উত্তু্ঙ্গ বাতাস এসেছে আকাশের বুক থেকে নেমে

আমার জানালার ভিতর দিয়ে, শাঁই শাঁই করে,

সিংহের হুঙ্কারে উৎক্ষিপ্ত হরিৎ প্রান্তরের অজস্র জেব্রার মতো!

 

হৃদয় ভরে গিয়েছে আমার বিস্তীর্ণ ফেল্টের সবুজ ঘাসের গন্ধে,

দিগন্ত- প্লাবিত বলীয়ান রৌদ্রের আঘ্রাণে

মিলনোন্মত্ত বাঘিনীর গর্জনের মতো অন্ধকারের চঞ্চল বিরাট সজীব রোমশ

উচ্ছ্বাসে,

জীবনের দুর্দান্ত নীল মত্ততায়!

 

আমার হৃদয় পৃথিবী ছিঁড়ে উড়ে গেল,

নীল হাওয়ার সমুদ্রে স্ফীত মাতাল বেলুনের মতো গেল উড়ে,

একটা দূর নক্ষত্রের মাস্তুলকে তারায়-তারায় উড়িয়ে নিয়ে চলল

একটা দুরন্ত শকুনের মতো।

 

কবিতা । চৈত্র ১৩৪২

কুড়ি বছর পরে - জীবনানন্দ দাশ

 

কুড়ি বছর পরে
জীবনানন্দ দাশ

 

আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি।

আবার বছর কুড়ি পরে -

হয়তো ধানের ছড়ার পাশে

কার্তিকের মাসে-

তখন সন্ধ্যার কাক ঘরে ফেরে- তখন হলুদ নদী

নরম-নরম হয় শর কাশ হোগলায়- মাঠের ভিতরে।

 

অথবা নাইকো ধান ক্ষেতে আর;

ব্যস্ততা নাইকো আর,

হাঁসের নীড়ের থেকে খড়

পাখির নীড়ের থেকে খড়

ছড়াতেছে; মনিয়ার ঘরে রাত, শীত আর শিশিরের জল।

 

জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার –

তখন হঠাৎ যদি মেঠো পথে পাই আমি তোমারে আবার।

 

হয়তো এসেছে চাঁদ মাঝরাতে একরাশ পাতার পিছনে

সরু- সরু কালো কালো ডালপালা মুখে নিয়ে তার,

শিরীষের অথবা জামের,

ঝাউয়েরআমের;

কুড়ি বছরের পরে তখন তোমারে নাই মনে।

 

জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার –

তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার আমার!

 

তখন হয়তো মাঠে হামাগুড়ি দিয়ে পেঁচা নামে__

বাবলার গলির অন্ধকারে

অশথের জানালার ফাঁকে

কোথায় লুকায় আপনাকে

চোখের পাতার মতো নেমে চুপি কোথায় চিলের ডানা থামে-

 

সোনালি সোনালি চিল- শিশির শিকার করে নিয়ে গেছে তারে-

কুড়ি বছরের পরে সেই কুয়াশায় পাই যদি হঠাৎ তোমারে।

 

কবিতা । পৌষ ১৩৪২

বনলতা সেন জীবনানন্দ দাশ

 

বনলতা সেন
জীবনানন্দ দাশ

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,

সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে

অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধুসর জগতে

সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;

আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,

আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।

 

মুখ তার শ্রাবন্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের পর

 

হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা

সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি- দ্বীপের ভিতর,

তেমনই দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, “এতদিন কোথায় ছিলেন?”

পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

 

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মত্ন

সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;

পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন

তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;

সব পাখি ঘরে আসে-সব নদী-_ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;

থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।

 

কবিতা । পৌষ ১৩৪২

রবিবার, ২ অক্টোবর, ২০২২

সুলেখার ক্রন্দন - বনফুলের শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প

 

সুলেখার ক্রন্দন
বনফুল

 

সুলেখা কাঁদিতেছে।

গভীর রাত্রি, বাহিরে জ্যোৎস্নায় ফিনিক ফুটিতেছে। এই স্বপ্নময় আবেষ্টনীর মধ্যে দুগ্ধফেননিভ শয্যায় উপুড় হইয়া শুইয়া ষোড়শী তন্বী সুলেখা অঝোরে কাঁদিতেছে। একাঘরে আর কেহ নাই। চুরি করিয়া একফালি জ্যোৎস্না জানালা দিয়া ঘরে প্রবেশ করিয়াছে। প্রবেশ করিয়া এই ব্যথাতুরা অশ্রুমুখী রূপসীকে দেখিয়া সে যেন থমকিয়া দাড়াইয়া আছে। কেন এ ক্রন্দন?

প্রেম? হইতে পারে বইকি। এই জ্যোৎস্না-পুলকিতা যামিনীতে সুন্দরী ষোড়শীর নয়নপল্লবে অশ্রুসঞ্চারের কারণ প্রেম হইতে পারে। সুলেখার জীবনে প্রেম একবার আসি-আসি করিয়াছিল তো! তখনও তাহার বিবাহ হয় নাই। অরুণদা নামক যুবকটিকে সে মনে মনে শ্রদ্ধা করিতঅতীব সঙ্গোপনে এবং মনে মনে। এই শ্রদ্ধাই স্বাভাবিক নিয়মে প্রেমে পরিণত হইতে পারিত, কিন্তু সামাজিক নিয়ম তাহাতে বাধা দিল। সামাজিক নিয়ম অনুসারে অরুণদা নয়, বিপিন নামক জনৈক ব্যক্তির লোমশ গলদেশে সুলেখা বর-মাল্য অর্পণ করিল।

হয়তো এই গভীর রাত্রিতে জ্যোৎস্নার আবেশে সেই অরুণদাকেই তাহার বার বার মনে পড়িতেছে। নির্জন শয্যায় তাহারই স্মরণে হয়তো এই অশ্রু-তর্পণ! তবে ইহাও ঠিক যে, তাহার গোপন হৃদয়ের ভীরু বার্তাটি সে অরুণদাকে কখনও জানায় নাই। মনে মনে তাহার যে আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষা জাগিয়া উঠিয়াছিল, বিবাহের পর তাহা ধীরে ধীরে কালের অমোঘ নিয়মানুসারে আপনিই নিবিয়া গিয়াছে।

বিপিন যদিও অরুণদা নয়, কিন্তু বিপিনবিপিন।একেবারে খাঁটি বিপিন। এবং আশ্চর্যের বিষয় হইলেও ইহা সত্য কথা যে, বিপিনের বিপিনত্বকে সুলেখা ভালোবাসিয়াছিল। ভালোবাসিয়া সুখীও হইয়াছিল। সহসা আজ নিশীথে সেই বিস্মৃতপ্রায অরুণদাকে মনে পড়িয়া আঁখিপল্পব সজল হইয়া উঠিবে, সুলেখার মন কি এতটা অতীতপ্রবণ?

হইতে পারে। নারীর মন বিচিত্র। তাহাদের মনস্তত্ত্বও অদ্ভুত। সে সম্বন্ধে চট করিয়া কোনও মন্তব্য করা উচিত মনে করি না। বস্তুত স্ত্রী-জাতির সম্বন্ধে কোনও কিছু মন্তব্য করাই দুঃসাহসের কার্য। যে রমণীকে দেখিয়া মনে হয় বয়স বোধ হয় উনিশ-কুড়িঅনুসন্ধন করিয়া জানা গিয়াছে তাহার বয়স পঁয়ত্রিশ। এতদনুসারে সাবধানতা অবলম্বন করিয়া পুনরায় কাহারও বয়স যখন অনুমান করিলাম পঁচিশ, প্রমাণিত হইয়া গেল তাহার বয়ঃক্রম পনর বৎসরের এক মিনিট অধিক নয়।

সুতরাং নারী সংক্রান্ত কোনও ব্যাপারে বেকুবের মতো ফস্‌ করিয়া কিছু একটা বলিয়া বসা ঠিক নয়। সর্বদাই ভদ্রভাবে ইতস্তত করা সঙ্গত। ইহাই সার বুঝিয়াছি এবং সেই জন্যই সুলেখার ক্রন্দন সম্বন্ধে সহসা কিছু বলিব না। কারণ আমি জানি না। ক্রন্দনের শোভন ও সঙ্গত কারণ যতগুলি হওয়া সম্ভব তাহাই বিবৃত করিতেছি।

গভীর রাত্রে একা ঘরে একটি যুবতী শয্যায় শুইয়া ক্রমাগত কাঁদিয়া চলিয়াছেইহা একটি ডিটেক্টিভ উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদের বিষয়ও হইতে পারে। কিন্তু আমরা বিশ্বস্তসূত্রে অবগত আছি, তাহা নয়। পাঠক-পাঠিকাগণ এ বিষয়ে অন্তত নিশ্চিন্ত হউন। বিপিন এবং সুলেখাকে যত দূর জানি, তাহাতে তাহাদের ডিটেক্টিভ উপন্যাসের নায়ক-নায়িকা হইবার মতো যোগ্যতা আছে বলিয়া মনে হয় না।

অরুণদার কথা ছাড়িয়া দিলে সুলেখার ক্রন্দনের আর একটি সম্ভাবনার কথা মনে হইতেছে। কিছুদিন পূর্বে সুলেখার একটি সন্তান হইয়াছিল। তাহার প্রথম সন্তান। সেটি হঠাৎ মাস দুই পূর্বে ডিপথিরিয়াতে মারা গিয়াছে। হইতে পারে সেই শিশুর মুখখানি সুলেখার জননী-হৃদয়কে কাঁদাইতেছে। শিশুটির মৃত্যুর পর সুলেখার দুই দিন ফিটহয়ইহা তো আমরা বিশ্বস্তসূত্রে জানি। চিরকালের জন্য যাহা হারাইয়া গিয়াছে, তাহাকে ক্ষণিকের জন্যও ফিরিয়া পাইবার আকুলতা কঠোর পুরুষের মনেও মাঝে মাঝে হয়। কোমলহৃদয়া রমণীর অন্তঃকরণে তাহা হওয়া কিছুমাত্র বিচিত্র নহে। ক্রন্দনের কারণ পুত্রশোক হইতে পারে। অবশ্যই হইতে পারে।

কিন্ত হ্যাঁ, আর একটা কারণও তো হইতে পারে। পুত্রশোক-প্রসঙ্গের পর এই কথাটি বলিতেছি বলিয়া আপনারা আমাকে ক্ষমা করুন; কিন্তু সুলেখার ত্রন্দনের এই তুচ্ছ সম্ভাবনাটা আমি উপেক্ষা করিতে পারিলাম না। বিগত কয়েক দিবস হইতে একটি নামজাদা ছবি স্থানীয় সিনেমা-হাউসে দেখানো হইতেছে। পাড়ার যাবতীয় নর-নারী সদলবলে গিয়া ছবিটি দেখিয়া আসিয়াছেন এবং উচ্ছসিত হইয়া প্রশংসাবাক্য উচ্চারণ করিতেছেন। কিন্ত বিপিন লোকটি এমনই বেরসিক যে, সুলেখার বারম্বার অনুরোধ সত্তেও সে সুলেখাকে উক্ত ছবি দেখাইতে লইয়া যায় নাই। প্রাঞ্জল ভাষায় প্রত্যাখ্যান করিয়াছে। সুলেখার যাহা ভালো লাগে, প্রায়ই দেখা যায় বিপিনের তাতে রাগ হয়। আশ্চর্য লোক এই বিপিন! কিছুক্ষণ আগেই সিনেমার লাস্ট শো হইয়া গিয়াছে। সুলেখার শয়নঘরের বাতায়নের নীচে দিয়াই সিনেমাতে যাইবার পথ। দর্শকের দল খানিকক্ষণ আগেই এই রাস্তা দিয়া সোল্লাসে হল্লা করিতে করিতে বাড়ি ফিরিল। হয়তো তাহাতেই সুলেখার সিনেমা-শোক উথলিয়া উঠিয়াছে। কিন্তু সে একা কেন? বিপিন কোথায়? সে কি বেগতিক দেখিয়া এই গভীর রাত্রেই কল্যকার জন্যসীট বুককরিতে গিয়াছে?

হইতে পারে। তরুণী পত্নীকে শান্ত করিবার জন্য মানুষ সব করিতে পারে। হোক না বিপিন লোমশ, সে মানুষ তো! তাহা ছাড়া বিপিন সুলেখাকে সত্যই ভালোবাসিতইহাও আমরা বিশ্বস্তসূত্রে অবগত আছি। কারণ আমরালেখকরাঅনেক কথাই বিশ্বস্তসূত্রে অবগত থাকি। সুতরাং এই ত্রন্দন সিনেমা-ঘটিত হওয়াও কিছুমাত্র অসম্ভব নহে।

সবই হওয়া সম্ভব। বাস্তবিক, যতই ভাবিতেছি ততই আমার বিশ্বাস হইতেছে সুলেখার ক্রন্দনের হেতু সবই হইতে পারে। এমন কি আজও সন্ধ্যাকালে সামান্য একটা কাপড়ের পাড় পছন্দ-করা প্রসঙ্গে সুলেখার সহিত বিপিনের সাংঘাতিক মততেদ হইয়া গিয়াছে। রূঢ়ভাষী পুরুষমানুষেরা সাধারণত যাহা করে বিপিন তাহাই করিয়াছে। গলার জোরেঅর্থাৎ চিৎকার করিয়া জিতিয়াছে। মৃদুভাষিণী তরুণীগণ সাধারণতঃ যে উপায়ে জিতিয়া থাকেন, সুলেখা সম্ভবত তাহাই অবলম্বন করিয়াছেঅর্থাৎ কাঁদিতেছে।

কারণ যাহাই হউক, ব্যাপরটা নিঃসন্দেহে করুণ। রাত্রি গভীর এবং জ্যোৎস্না মনোহারিণী হওয়াতে আরও করুণঅর্থাৎ করুণতর। কোনও সহদয় পাঠক কিংবা পাঠিকা যদি ইহাকে করুণতমও বলেন তাহা হইলেও আমার প্রতিবাদ করিবার কিছু পাবে না। কারণ সুলেখা তরুণী রাত্রি যতই নিবিড় এবং জ্যোৎস্না যতই আকাশপ্লাবিনী হউক না কেন, এ বিষয়ে খুব সম্ভবত আমরা একমত যে, এই রাত-দুপুরে একটা বালক কিংবা একটা  বুড়ি কাঁদিলে আমরা এতটা আর্দ্র হইতাম না, উপরন্ত হয়তো বিরক্তই হইতাম।

সুলেখা কিন্তু তরুণী মন সুতরাং দ্রব হইয়াছে এবং কথাও অস্বাকীর করিবার উপায় নাই যে, সুলেখার ক্রন্দনের কারণ না নির্ণয় করা পর্যন্ত স্বস্তি পাইতেছি না এমনকি অরুণদাকে জড়াইয়া একটা সস্তা গোছের কাব্য করিতেও মন উৎসুক হইয়া উঠিয়াছে মন বলিতেছে, “কেন নয়? এমন চাঁদনী রাতে কৈশোরের সেই অর্ধ প্রস্ফুটিত প্রণয়-প্রসূন সহসা পূর্ণ-প্রস্ফুটিত হইতে পারে নাকি? ওই তো দূরে চোখ গেলপাখি অশ্রান্ত সুরে ডাকিয়া চলিয়াছে। সম্মুখের বাগানে রজনীগন্ধা স্বপ্ন-বিহ্বল! চতুর্দিকে জ্যোস্নার পাথার! এমন দুর্লভক্ষণে অরুণদার কথা মনে হওয়া কি অসম্ভব, না, অপরাধ?” মনের বক্তৃতা বন্ধ করিয়া কপাটটা হঠাৎ খুলিয়া গেল ব্যস্ত-সমস্ত বিপিন প্রবেশ করিল। মুখে শঙ্কার ছায়া সিনেমার টিকিট পায় নাই সম্ভবত। কিন্ত এ কি!

বিপিন জিজ্ঞাসা করিল— “দাঁতের ব্যথাটা কমেছে?”

না, বড্ড কনকন করছে

এই পুরিয়াটা খাও তা হলে। ভাক্তারবাবু কাল সকালে আসবেন বললেন, কেঁদে আর কি হবে! এটা খেলেই সেরে যাবে। খাও, লক্ষ্মীটি!”

জ্যোৎস্নার টুকরাটি মুচকি মুচকি হাসিতেছে।

দেখিলেন তো? বলিয়াছিলাম, সবই সম্ভব!

শনিবার, ১ অক্টোবর, ২০২২

বনফুলের শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প - মানুষের মন

 বনফুলের শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প - মানুষের মন 

মানুষের মন - বনফুল


মানুষের মন

বনফুল

রেশ ও পরেশ। দুইজনে সহোদর ভাই। কিন্তু এক বৃন্তে দুইটি ফুলএ উপমা ইহাদের সম্বন্ধে খাটে না আকৃতি ও প্রকৃতি—  উভয় দিক দিয়াই ইহাদের মিলের অপেক্ষা অমিলই বেশি। নরেশের চোহারার মোটামুটি বর্ণনাটা এইরূপ শ্যাম বর্ণ, দীর্ঘ দেহ, খোচা-খোঁচা চিরুনি-সম্পর্ক-বিরহিত চুল, গোলাকার মুখ এবং সেই মুখে একজোড়া বুদ্ধিদীপ্ত চক্ষু একজোড়া নেউলের লেজের মতো পুষ্ট গোঁফ এবং একটি সুক্ষ্মাগ্র শুষ্কচঞ্চু নাসা।

পরেশ খর্বাকৃতি, ফরসা, মাথার কোঁকড়ানো কেশদাম বাবরি আকারে সুসজ্জিত, মুখটি একটু লম্বা-গোছের, নাকটি থ্যাবড়া, চক্ষু দুইটিতে কেমন যেন একটা তন্ময় ভাব, গোঁফদাড়ি কামানো, গলায় কণ্ঠি, কপালে চন্দন।

মনের দিক দিয়া বিচার করিলে দেখা যায় যে দুইজনেই গোঁড়া। একজন গোঁড়া বৈজ্ঞানিক এবং আর একজন গোঁড়া বৈষ্ণব। অত্যন্ত নিষ্ঠাসহকারে নরেশ জ্ঞানমার্গ এবং পরেশ ভক্তিমার্গ অবলম্বন করিয়াছেন।

যখন নরেশের ‘কমবাইন্ড হ্যান্ড’ চাকর নরেশের জন্য ফাউল কাটলেট বানাইতে ব্যস্ত এবং নরেশ থিওরি অফ রিলেটিভিটি লইয়া উন্মত্ত তখন সেই একই বাড়িতে পরেশ স্বপাক নিরামিষ আহার করিয়া যোগবাশিষ্ট রামায়ণে মগ্ন ইহা প্রায়ই দেখা যাইত।

তাই বলিয়া ভাবিবেন না যে, উভয়ে সর্বদা লাঠালাঠি করিতেন, মোটেই তা নয়। ইহাদের কলহ মোটেই নাই। তাহার সুস্পষ্ট কারণ বোধহয় এই যে, অর্থের দিক দিয়া কেহ কাহারও মুখাপেক্ষী নন।

       উভয়েই এম. এ. পাসনরেশ কেমিস্ট্রিতে এবং পরেশ সংস্কৃতে। উভয়েই কলেজের প্রোফেসারি করিয়া মোটা বেতন পান। মরবার পূর্বে পিতা দুইজনকেই সমান ভাগে নগদ টাকাও কিছু দিয়া গিয়াছিলেন। যে বাড়িতে ইহারা বাস করিতেছেনইহাও পৈতৃক সম্পত্তি। বাড়িটি বেশ বড়। এত বড় যে ইহাতে দুই-তিনটি পরিবার পুত্র-পৌত্রাদি লইয়া বেশ স্বচ্ছন্দে বাস করিতে পারে। কিন্তু নরেশ এবং পরেশ দুইজনেই পরিবারহীন। নরেশ বিবাহ করিয়াছিলেন। কিন্তু বিবাহের কিছুদিন পরেই পত্নী ইহলোক ত্যাগ করাতে তাহার এবং পরেশের মনে পৃথিবীর অনিত্যতা সম্বন্ধে এমন একটা উপলব্ধি আসিল যে, কেহই আর বিবাহ করিলেন না। পরেশ ভাবিলেন, ‘কা তব কান্তা’— ইহাই সত্য। রিলেটিভিটির ছাত্র নরেশ ভাবিতে লাগিলেন, নির্মলা সত্যই কি মরিয়াছে? আমি দেখিতে পাইতেছি নাএই মাত্র।

সুতরাং নরেশ এবং পরেশ সহোদর হওয়া সত্ত্বেও ভিন্ন প্রকৃতির এবং ভিন্ন প্রকৃতির হওয়া সত্তেও একই বাড়িতে বাস করেন।

এক বিষয়ে কিন্তু উভয়ের মিলও ছিল।

পল্টুকে উভয়ে ভালোবাসিতেন। পল্টু তপেশের পুত্র। নরেশ এবং পরেশের ছোট ভাই তপেশ। এলাহাবাদে চাকুরি করিত। হঠাৎ একদিন কলেরা হইয়া তপেশ এবং তপেশের পত্নী মনোরমা মারা গেল। টেলিগ্রামে আহূত নরেশ এবং পরেশ গিয়া তাহাদের শেষ কথাগুলি মাত্র শুনিবার অবসর পাইলেন। তাহার মর্ম এই— “আমরা চললাম। পল্টুকে তোমরা দেখো।” পল্টুকে লইয়া নরেশ এবং পরেশ কলিকাতায় ফিরিয়া আসিলেন। তপেশের অংশে পৈত্রিক কিছু টাকা ছিল। নরেশ তাহার অর্ধাংশ পরেশের সন্তোষার্থে রামকৃষ্ণ মিশনে দিবার প্রস্তাব করিবামাত্রই পরেশ বলিলেন,—  বাকি অর্ধেকটা তা হলে বিজ্ঞানের উন্নতিকল্পে খরচ হোক।” তাহাই হইল। পল্টুর ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে তাহারা ভাবিলেন যে, তাহারা নিজেরা যখন কেহই সংসারী নহেন তখন পল্টুর আর ভাবনা কি?

পল্টু, নরেশ এবং পরেশ উভয়েরই নয়নের মণিরূপে বাড়িয়া উঠিতে লাগিল। নরেশ এবং পরেশ কেহই নিজের মতবাদ পল্টুর উপর ফলাইতে যাইতেন না। পল্টুর যখন যাহা অভিরুচি সে তাহাই করিত। নরেশের সঙ্গে আহার করিতে করিতে যখন তাহার মুরগি সম্বন্ধে মোহ কাটিয়া আসিত, তখন সে পরেশের হবিষ্যান্নের দিকে কিছুদিন ঝুঁকিত। ভোজনশালায় ফিরিয়া যাইতেও তাহার বাধিত না।

নরেশ এবং পরেশ উভয়েই তাহাকে কোনও নির্দিষ্ট বাঁধনে বাঁধিতে চাহিতেন নাযদিও দুইজনেই মনে মনে আশা করিতেন যে, বড় হইয়া পল্টু তাহার আদর্শকেই বরণ করিবে।

পল্টুর বয়স ষোল বৎসর। এইবার ম্যাট্রিক দিবে। সুন্দর স্বাস্থ্য, ধপধপে ফরসা গায়ের রঙ, আয়ত চক্ষু। নরেশ এবং পরেশ দুইজনেই সর্বস্তঃকরণে পল্টুকে ভালোবাসিতেন। এ বিষয়ে উভয়ের কিছুমাত্র অমিল ছিল না।

এই পল্টু একদিন অসুখে পড়িল।

নরেশ এবং পরেশ চিন্তিত হইলেন। নরেশ বৈজ্ঞানিক মানুষ, তিনি স্বভাবতঃই একজন অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তার লইয়া আসিলেন। পরেশ প্রথমটায় কিছু আপত্তি করেন নাই; কিন্তু যখন উপর্যুপরি সাত দিন কাটিয়া গেল, জ্বর ছাড়িল না তখন তিনি আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। নরেশকে বলিলেন— “আমার মনে হয় একজন ভালো কবিরাজ ডেকে দেখালে কেমন হত?”

বেশ, দেখাও।”

কবিরাজ আসিলেন, সাত দিন চিকিৎসা করিলেন। জ্বর কমিল না, বরং বাড়িল। পল্টু প্রলাপ বকিতে লাগিল। অস্থির পরেশ তখন নরেশকে বলিলেন, “আচ্ছা, একজন জ্যোতিষীকে ডেকে ওর কুষ্ঠিটা দেখালে কেমন হয়? কি বল?”

বেশ তো! তবে যাই কর, এ জ্বর একুশ দিনের আগে কমবে না। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন টাইফয়েড।”

তাই নাকি?”

পল্টুর কোষ্ঠি লইয়া ব্যাকুল পরেশ জ্যোতিষীর বাড়ি ছুটিলেন। জ্যোতিষী কহিলেন-_“মঙ্গল মারকেশ। তিনি রুষ্ট, হইয়াছেন।” কি করিলে তিনি শান্ত হইবেন, তাহার একটা ফর্দ দিলেন। পরেশ প্রবাল কিনিয়া পল্টুর হাতে বাঁধিয়া মঙ্গলের শান্তির জন্য শাস্ত্রীয় ব্যবস্থাদি করিতে লাগিলেন।

অসুখ কিন্তু উপরোত্তর বাড়িয়াই চলিয়াছে। নরেশ একদিন বলিলেন— “কবিরাজি ওষুধেতে বিশেষ উপকার হচ্ছে না, ডাক্তারকেই আবার ডাকব নাকি?”

তাই ডাক না হয়!”

নরেশ ডাক্তার ডাকিতে গেলেন। পরেশ পল্টুর মাথার শিয়রে বসিয়া মাথায় জলপটি দিতে লাগিলেন। পল্টু প্রলাপ বকিতেছে— “মা আমাকে নিয়ে যাও। বাবা কোথায়?”

আতঙ্কে পরেশের বুকটা কাঁপিয়া উঠিল। হঠাৎ তাহার মনে হইল, তারকেশ্বরে গিয়া ধরণা দিলে শুনিয়াছি দৈব ষধ পাওয়া যায়। ঠিক।

নরেশ ফিরিয়া আসিতেই পরেশ বলিলেন— “আমি একবার তারকেশ্বর চললাম, ফিরতে দু-এক দিন দেরি হবে।”

হঠাৎ তারকেশ্বর কেন?”

বাবার কাছে ধরনা দেব।”

নরেশ কিছু বলিলেন না। ব্যস্তসমস্ত পরেশ বাহির হইয়া গেলেন। ডাক্তার পরীক্ষা করিয়া বলিলেন— “বড় খারাপ টার্ন নিয়েছে।”

ডাক্তারি চিকিৎসা চলিতে লাগিল।

দিন দুই পরে পরেশ ফিরিলেন। হস্তে একটি মাটির ভাঁড়। উল্লসিত হইয়া তিনি বলিলেন— “বাবার স্বপ্নাদেশ পেলাম। তিনি বললেন যে, রোগীকে যেন ইঞ্জেকশন দেওয়া না হয়। আর বললেন, এই চরণামৃত রোজ একবার করে খাইয়ে দিতে, তা হলেই সেরে যাবে।”

ডাক্তারবাবু আপত্তি করিলেন। নরেশও আপত্তি করিলেন। টাইফয়েড রোগীকে ফুল-বেলপাতা-পচা জল কিছুতেই খাওয়ানো চলিতে পারে না।

 হতবুদ্ধি পরেশ ভান্ডহস্তে চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন।

আসলে কিন্তু ব্যাপার দাঁড়াইল অন্যরূপ। পরেশের আগোচের পল্টুকে ডাক্তারবাবু থাবিধি ইঞ্জেন দিতে লাগিলেন এবং ইহাদের আগোচরে পরেশ লুকাইয়া পল্টুকে প্রত্যহ একটু চরণামৃত পান করাইতে লাগিলেন।

কয়েকদিন চলিল। রোগের কিন্তু উপশম নাই।

গভীর রাত্রিতে হঠাৎ নরেশ পাশের ঘরে গিয়া পরেশকে জাগাইলেন।

ডাক্তারবাবুকে একবার খবর দেওয়া দরকার, পল্টু কেমন যেন করছে!”

আ্যা, বল কি?”

পল্টুর তখন শ্বাস উঠিয়াছে।

উন্মাদের মতো পরেশ ছুটিয়া নীচে নামিয়া গেলেন ডাক্তারকে “ফোন” করিতে। তাহার গলার স্বর শোনা যাইতে লাগিল

হ্যালোশুনছেন ডাক্তারবাবু, হ্যালোহাঁ, হাঁ, আমার আর ইঞ্জেন দিতে আপত্তি নেইবুঝলেন— হ্যালোবুঝলেনআপত্তি নেইআপনি ইঞ্জেকশন নিয়ে শিগগির আসুনআমার আপত্তি নেই, বুঝলেন—”

এদিকে নরেশ পাগলের মতো চরণামৃতের ভাঁড়টা পড়িয়া চামচে করিয়া খানিকটা চরণামৃত লইয়া পল্টুকে সাধ্যসাধনা করিতেছেন— “পল্টু খাও, খাও তো বাবা—  একবার খেয়ে নাও একটু—”

তাহার হাত থরথর করিয়া কাঁপিতেছে, চরণামৃত কশ বাহিয়া পড়িয়া গেল।


রূপকথা - বনফুল

 বনফুলের শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প 

রূপকথা 

রূপকথা - বনফুল বনফুলের শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প 


রূপকথা

বনফুল

 

সুন্দর জ্যোৎস্না!

চারিদিকে জনমানবের সাড়া নাই। গভীর রাত্রি। দূর হইতে নদীর কলকল ধ্বনি ভাসিয়া আসিতেছে। নির্জন প্রান্তরে একা দাঁড়াইয়া আছি। স্বপ্ন-বিহ্বল নেত্রে দেখিতেছি, জ্যোৎস্নায় ভুবন ভাসিয়া যাইতেছে। কুৎসিত জিনিসও সুন্দর হইয়া উঠিল। ওই পচা- ডোবাটাও যেন জরিদার কাপড় পরিয়া মোহিনী সাজে সাজিয়াছে। আকাশের কালো মেঘটাতেও রূপালি আবেশ।

নির্জন প্রান্তরে একা দাঁড়াইয়া আছি। তাহারই প্রতীক্ষায়। তাহারই প্রতীক্ষায় এই গভীর রাত্রির সমস্ত জ্যোৎস্নাও যেন পরিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে।

আসিতেছে। হাঁ, ওই যে! সর্বাঙ্গে তাহার জ্যোতস্নার আকুলতা। তাহার নুপুরশিঞ্জনে জ্যোৎস্না শিহরিয়া উঠিতেছে।...ওই সে আমার পানে চাহিয়া হাসিল।

সহসা একটা দুর্ধর্ষ দস্যু কোথা হইতে ছুটিয়া আসিয়া সেই কিশোরীর বুকে ছুরি বসাইয়া দিল। জ্যোস্নায় শাণিত ছোরাটা চকক্‌ করিয়া উঠিল! রক্তের ধারায় জ্যোৎস্না ডুবিয়া গেল।

উর্ধ্বশ্বাস ছুটিয়া গিয়া লোকটাকে ধরিলাম। ধরিয়া দেখিএ কি, এ যে আমারই বিবেক!


চরিতকথা - রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী রচিত প্রবন্ধ 'বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়'

  বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী রচিত ‘ চরিতকথা ’ থেকে চরিতকথা - রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী  ( ১৩১২ সালের ২৬শে চৈত্র...

জনপ্রিয়তার হিসেবে